অশ্লীল

সরোজ দরবার

ভয় হয়! সামলাতে পারবে তো! ভিতর থেকে সবকিছু যদি বেরিয়ে আসে; এই রাস্তায়, সকলের সামনে। বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে।
আর-একটু গেলেই বাড়ি। বাড়ি তবু যাওয়া হল না। ফাঁকা জায়গাটায় সে বসে পড়ে। আচমকা তার মনে পড়ে, দিনটা ঠিক এখান থেকেই শুরু হয়েছিল তার, এমনভাবে, যেভাবে শুরু হওয়ার কথা ছিল না।
অথচ চমৎকার মোচার ঘণ্ট; চমৎকার মোচার ঘণ্ট রেঁধেছিল কাজের দিদি। এমনিতে রান্নার হাতটা একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে মহিলার। অভ্যেস অনেক ভালো জিনিসকেও জোলো করে তোলে। কিন্তু মোচার স্বাদটা আজ ভালো খুলেছিল; দিনটাই আলাদা; অন্যরকম; দূর থেকে দাঙ্গার খবর আসছিল। যেখানে হচ্ছে, সেখান থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরেই অবশ্য আছে সে। দূরত্ব আর প্রতিক্রিৠা ব্যস্তানুপ াতিক; এমনটা সে মনে মনে ধরে নেয়। কেন-না এই একই জিনিস তার ঘরের পাশে হলে সে কি এমন তারিয়ে তারিয়ে মোচার ঘণ্ট খেতে পারত আজ!
মুখ ধোওয়ার পরও এলাচ-গরম মশলা মেশানো একটা সুন্দর স্বাদ জিভ-দাঁত-মাৠœà¦¿à¦° ফাঁকে ফাঁকে থেকে গেল। সেদিকে মন গেলেই মনে পড়ছিল, আজ দিনটা অন্যরকম।

২)
কিছু কাজ থাকে; বেরোতেই হয়; খেয়েদেয় সে বেরিয়ে পড়েছিল। আর, থমকে গিয়েছিল এই জায়গাটায় এসে।
এমনিতে না দাঁড়ালেও চলত। কিন্তু না দাঁড়ালেই চলছিল না যেন। কেন-না একজন সুন্দরী ঠিক এইখানটায় বসে হাঁফাচ্ছিঠ। প্রবল; যেন তার প্রাণ বেরিয়ে যায় যায়; তার চোখমুখ টকটকে লাল তখন; অসম্ভব ঘামে সে ভিজে যাচ্ছে; সম্ভবত সে বমি করতে চাইছে; হচ্ছে না; দু-চারজন লোক তার দিকে তাকাচ্ছে। তারপর চলেও যাচ্ছে। সকলেরই কাজ থাকে। রাস্তায় যে ছেলেমেয়েগ ুলো দু-এক টাকার জন্য ঝোলাঝুলি করে অন্যান্য দিনে, তারাই সুন্দরীকে ঘিরে এ-দিক ও-দিক দাঁড়িয়েছিঠ²à¥¤ কিন্তু তারা কিছু করছিল না; সত্যি বলতে এরকম বড়োমানুষদৠর কিছু হলে, কী যে করতে হয়, তা বেচারিরা জানতই না।
তারও জরুরি কাজ ছিল। কিন্তু সে দাঁড়িয়েই পড়ল। ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বের করে উবু হয়ে বসল; ছিপি খুলে বোতলটা মেয়েটার মুখের সামনে ধরল। মেয়েটা যেন এটুকুর à¦…à¦ªà§‡à¦•à§à¦·à¦¾à¦¤à§‡à ¦‡ হাঁফাচ্ছিঠ। জল পেয়ে প্রাণ ফিরে পেল।
আর, আশ্চর্য মেয়েটা, সেই অপিরিচিতা সুন্দরী তার কাঁধে মাথা দিয়ে ঠিক তখনই শরীরের সব ভার ছেড়ে দিল; যেন তার ওঠার ক্ষমতাটুকৠ পর্যন্ত নেই।
à§©)
মহা ফাঁপর! কিন্তু কী আর করা যাবে!
মানুষকে কখনও কখনও একটু অন্যরকম হতে হয়। আজ দিনটাই আলাদা।
ট্যাক্সিতৠবসে বসে সে এইসব কথাই ভাবছিল। তার ঠিক পাশেই বসেছিল মেয়েটা; অনেক কষ্টে সে শুধু বলতে পেরেছিল তার বাড়ির ঠিকানা।
মেয়েটির মাথা সিটে এলানো; ট্যাক্সির দুলুনিতে তা অল্পস্বল্ঠনড়ছে। সে দেখল, মেয়েটির উজ্জ্বল গ্রীবায় চমৎকার একবিন্দু তিল। এখন চোখ বন্ধ করে আছে মেয়েটি। তাকে কেন কে জানে, এত অস্বস্ত-à¦…à¦¸à à¦¸à§à¦¥à¦¤à¦¾ সত্ত্বেও, ক্লান্তি ও ঘাম নিয়েও মোহময়ী লাগছে।
সে সুন্দরের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ ফেরাতে পারে না।
অথচ কোথাও নিশ্চয়ই এখন দাঙ্গা হচ্ছে; কোথাও কেউ কাউকে পিটিয়ে মারছে; হয়তো পরিচিত কেউ-ই সেই দাঙ্গায় এখন পুড়ছে। গলে গলে পড়ছে কোনও মানুষের চামড়া; কিংবা হয়তো রাষ্ট্রের লোকের বন্দুকের খোঁচা খেয়ে কঁকিয়ে কঁকিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে নিজেদের প্রাণে বাঁচাচ্ছে কেউ। যতক্ষণ না সে-সব জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ শান্তি। একবার জানতে পারলে পৃথিবীটাই বদলে যাবে; হয়তো বমি পাবে;
একটু আগে, ট্যাক্সিতৠবসে, একঝলক মোবাইল খুলেছিল সে; সেখানে আবার এইসব খবরের দোকান খোলা; তার এক বন্ধু তাকে বলেছিল, আজকালকার দিনে খবর থেকে দূরে থাকাই ভালো। আজ, তারও একইরকম মনে হল। বিরক্ত হয়ে তাই মোবাইল রেখে দিয়েছে সে। আর, তারপরেই ফিরে তাকিয়েছে মেয়েটির দিকে। এই সমস্ত তোলপাড়ের ভিতর মেয়েটাকে আশ্চর্য এক শান্ত পৃথিবী মনে হয়েছিল তার; যদিও তা তো সত্যি নয়।

৪)
মেয়েটির বাড়ির লোকেরা তাকে ধন্যবাদ দিয়েছিল। অতি দুর্দিনেও যে পাশে দাঁড়ানোর জন্য ঠিক একজন মানুষের মতো মানুষ থাকেন, এই কৃতজ্ঞতায় আল্লাহকে-ও তারা ধন্যবাদ জানিয়েছিলॠ¤
বেরোনোর মুখে মেয়েটিও তার মুখের দিকে তাকাল; বাঙ্ময় দু-চোখ; কিন্তু অর্থ যেন ধরা দিয়েও ধরা দেয় না; সবকিছু à¦…à¦¨à§à¦¬à¦¾à¦¦à¦¯à§‹à¦—à à¦¯ নয়। সে জানে। তাই সে-মেয়ের চোখ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে।
সেই অবসররে মেয়েটি তার ফোন নম্বরটি চেয়ে নিল।
সেদিন আর কাজের জায়গায় যাওয়া হল না। বাড়ি ফেরার পথে, হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবে, দিনটা আজ সত্যি অন্যরকম; সে জানে, বেশি নয়, তবু অনেকটা দূরে এখনও দাঙ্গা হচ্ছে। আজ, তার কাজের দিদি চমৎকার মোচা রেঁধেছে; কাজ কামাই হল বলে আগামিকাল কিছু অসুবিধার মুখেও তাকে পড়তে হবে। আবার, একই সঙ্গে একটি অপরিচিত মেয়ের স্পর্শ এখনও লেগে আছে তার সারাদিনে। যদিও সে জানে না, মেয়েটির কী হয়েছে; হয়তো জানবেও না; যদিও গোটা দিনটা প্রায় সে মেয়েটার পাশে পাশেই ছিল। সে ভাবে, মুখে বলা হয় বটে যে, ‘পাশে আছি’ কিংবা ‘সংহতি জানাচ্ছি’, কিন্তু সত্যিই একজন মানুষ, তার পাশের মানুষকে কতটুকুই বা জানতে পারে! কতটুকু পাশে থাকতে পারে!
একটু পরেই সে ঢুকে পড়বে তার একলার ঘরটিতে। এবেলার জন্যও খানিকটা মোচার ঘণ্ট রাখা আছে।
ভাবতে-ভাবতৠ‡ হাঁটতে-হাঁঠŸà¦¤à§‡ আচমকা তার জিভ গিয়ে পৌঁছায় বাঁ-দিকের উপরপাটির কষের দাঁতে। ওখানে একটা গর্ত আছে; মাঝেমধ্যেঠ‡ জিভ চলে যায়; বেশিরভাগ সময়েই বিস্বাদে বিরক্ত লাগে। আজ, কী অদ্ভুত, সেখান থেকে এই দিনের শেষে বেরিয়ে এল একটুখানি মোচার টুকরো। সেই গরম মশলা-এলাচ মেশানো স্বাদ লালায় লালায় আবার সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ছে। চনমনে নেশার মতো নিজের সেই লালাকে মুখের ভিতর চারপাশে খেলাতে খেলাতে একসময় সে গিলতে শুরু করে। একবার, দুবার...। আর, আচমকাই তার বমি পায়। প্রথমে অল্প; তারপর বেশ ভালোরকম গা গুলিয়ে ওঠে। গোড়ায় সে ভেবেছিল, সামলে নিয়ে বাড়ি চলে যাবে। বাড়ি এখান থেকে বেশি দূরে নয়। কিন্তু, তারপর বোঝে পারবে না; বসে পড়ে; ফাঁকা জায়গাটায়; অল্প অল্প হাঁপাতে থাকে; ভিতরে এখনও কী একটা পাক দিচ্ছে। আস্ত একটা মানুষই বুঝি বেরিয়ে আসতে চাইছে।
আর, ঠিক তখনই তার ভয় হয়। সামলাতে পারবে তো!ভিতর থেকে সবকিছু যদি বেরিয়ে আসে; এই রাস্তায়, সকলের সামনে।
কী বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার হবে না!

~~